অরণ্য মানবী
মোঃ তোফায়েল হোসেন
==================
আমার জন্ম অরণ্য ঘেরা এক বিশাল উপত্যকায়। গ্রামটার পূর্বে এবং দক্ষিণে রাজকান্দি রেঞ্জের বিশাল অরণ্য; তারপর গহীন অরণ্যেই আন্তর্জাতিক সীমানা। ওপারে ভারতের ত্রিপুরার গহীন অরণ্য। মোট কথা অরণ্যটা বিশাল এবং অনেক জায়গা এখনও অনাবিষ্কৃত। আর প্রকৃতির এমন অপরূপ সৃষ্টির মাঝে নিজের বেড়ে উঠার কারণে অরণ্য আমাকে সবসময়ই চুম্বকের মতো কাছে টানে। সময় সুযোগ হলে আমিও সেই টানে গা ভাসিয়ে দেই। বিশেষ করে যখন ইট-পাথরের যান্ত্রিক জীবন থেকে নিজেকে একটু ছুটি দিতে পারি তখনই সব ভুলে ছুটে যাই নিজের সেই অস্তিত্বের কাছে, নিজের ভালোবাসার কাছে।
গ্রাম থেকে দক্ষিণ-পুর্বে পাহাড়ের ভিতরে একদল উপজাতি বসবাস করে। তাদের সর্দার এক চিরকুমার বৃদ্ধ। আমার সাথে উনার একটা গভীর সম্পর্ক কিভাবে যে হয়েছিল তা নিজেও জানি না। আমরা পরস্পরকে গভীর ভালোবাসতাম। তাই ছুটি পেলেই গ্রামে যেতাম এবং দুই তিন ঘন্টার মধ্যেই বৃদ্ধের সামনে হাজির হতাম। আমার বেশির ভাগ সময় কেটে যেত বৃদ্ধের জীবনের ঘটনা র্দুঘটনার কাহিনী শুনে। এভাবে একদিন বৃদ্ধ অবিশ্বাস্য একটা কাহিনী শুনালেন-
যখন তিনি তরতাজা যুবক; তখন একদিন শিকারে গিয়ে এই অরণ্যেই একা হারিয়ে গিয়েছিলেন। পথের খোঁজে যখন ব্যস্ত ঠিক তখনই পা ফসকে একটা খাদে পড়ে যান। জ্ঞান হারানোর পর তার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়। যখন জ্ঞান ফিরল তখন তিনি দেখলেন ফুলে ফুলে সাজানো একটা বিছানায় শুয়ে আছেন। নিজের অবস্থান জানতে এদিক ওদিক তাকালেন। এমন সময় এক অপরূপ রূপসীকে তার শিয়রে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন। তার কন্ঠে রিনিঝিনি ঝঙ্কার বেজে উঠল। অদ্ভুদ ভাষায় কথা বলল। তবে তিনি ভাষাটা ধরতে পারলেন- খাসিয়া ও মণিপুরীদের ভাষার মিশ্রণ এটি। রূপসী নিজের নাম বলল- ইনতিলা। তারপর বিছানার পাশে বসে কিছু ফল খেতে দিল। তিনি নিজের অবস্থান জানতে চাইলে সে যা বলল তা শুনে ভয়ের একটা শিরশির অনুভূতি সমস্ত শরীর অবশ করে দিল।
ইনতিলা জানাল- “আমার বাবা এই গোত্রের সর্দার। আমরা তিন পুরুষ ধরে গহীন অরণ্যের এই ধ্বংসাবশেষে বসবাস করছি। গত রাতে আমার বাবা স্বপ্নে দেখলেন ঈশ্বর আমাদের জন্য উপহার পাঠাচ্ছেন। সকালেই তিনি একটা দল নিয়ে স্বপ্নের বর্ণনা অনুযায়ী রওয়ানা দিলেন। এবং যথাস্থানে গিয়ে তোমাকে পড়ে থাকতে দেখলেন। অজ্ঞান অবস্থায় বসতিতে নিয়ে এসে অতিথির সম্মান দেওয়া হল। আর আমাকে দেওয়া হল তোমাকে দেখাশুনা করার সার্বিক দায়িত্ব।
তোমাকে নিয়ে আসার পর বাবা যখন প্রার্থনা ঘরে প্রার্থনা করতে বসলেন। তখনই অলৌকিক আওয়াজ আসল- তোমাকে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে বলি দিতে হবে। আওয়াজটা এমন ছিল বসতির সবাই স্পষ্ট শুনতে পেলাম। কোন দ্বিধা দ্বন্ধ ছাড়াই বাবা ঘোষণা করলেন ঈশ্বরের আদেশ রক্ষার্থে আজ মধ্য রাতেই তোমাকে বলি দেওয়া হবে।”
তার কথা শুনে তিনি বোবা হয়ে গেলেন। শুধু দৃষ্টিহীনদের মতো চেয়ে রইলেন ইনতিলার পানে। অনেকটা সময় পরে উনার অবস্থা দেখার জন্য সর্দার ঘরে প্রবেশ করল। তিনি ব্যাকুল হয়ে তাকে বুঝাতে চাইলেন- এটা একটা কুসংষ্কার। সর্দার যেন তাকে ছেড়ে দেয়। কিন্তু সর্দার তার সিদ্ধান্তে অটল।
বুঝানোর সব প্রচেষ্টা যখন ব্যর্থ হলে তখন তিনি পালানোর চেষ্টা করলেন। কিন্তু নিরাপত্তা এত দৃঢ় ছিল যে কোন সুযোগই পেলেন না। ইনতিলা সর্বদা পাশাপাশি থাকল যেন তাদের আয়োজনে কোন ত্রুটি না থাকে। তবে তার চোখে একটা দু’টানার ছায়া দেখতে পাওয়া গেল। এক সময় তিনি ইনতিলাকে মুক্তির কথা বললেন। অনেকক্ষণ চিন্তা ভাবনার পর সে বলল- যে উনাকে পালাতে সাহায্য করবে তাকেই ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া হবে। হোক সে সর্দার নিজেই অথবা তার অতি আপনজন।
যন্ত্রনাদায়ক প্রহর কাটতে লাগল। নিজের নিয়ন্ত্রণ সম্পন্ন হারালেন তিনি। তারপর সন্ধ্যা ঘনালে উনার হাত পিছ মোড়া করে বাঁধা হল। কাছের একটা ঝর্ণায় নিয়ে যাওয়া হল। অনেকগুলো মশালের আলোয় আলোকিত সমস্ত এলাকাটা। ঝর্ণার পাশে ছোট একটা কুটির দেখতে পেলেন তিনি। কুটির থেকে বেরিয়ে এল ইনতিলা ও তার সাথে আরও তিন জন মহিলা। অপরূপ রূপসী একেকজন। সবার হাতেই সুন্দর সুন্দর ফুলে ভরা ফুলের ডালি। কাছে এসেই ফুল ছিটাতে লাগল উনার গায়ে। আর সাথে সাথে ইনতিলা বেদনার সুরে একটা গান ধরল- যার একটা শব্দও তিনি বুঝলেন না।
একসময় গান থামল; শুরু হল মন্ত্র পড়া। সবাই একসাথে মন্ত্র পড়ল আর কয়েকজন মিলে ঠেলে উনাকে ধিরে ধিরে নামিয়ে দিল ঝর্ণার পানিতে। গায়ের উপরের অংশের কাপড় খোলা হল। তারপর মন্ত্রের তালে তালে তাকে গোসল করানো হল। তিনি তখন স্বজ্ঞানে মৃত্য প্রায়। গোসল শেষে ঐ কুটিরে নেওয়া হল উনাকে। ইনতিলা ঘোষণা করল- সবাই বাহিরে যাও। আমি নিজ হাতে ঈশ্বরের ভোগ সাজাব।
সবাই কুটির থেকে বের হতেই তিনি শেষ চেষ্টা করতে চাইলেন। ইনতিলাকে কিছু বলতে চাইলেন। কিন্তু ইনতিলা ঠোঁটে আঙ্গুল তুলে চুপ থাকতে বলল। ধিরে ধিরে উনার কাছে আসল। একদম নগ্ন বুকে মিশে গেল। উনাকে জড়িয়ে ধরে হালকা একটা চাপ দিয়ে ছেড়ে দিল। তারপর আলতো করে উনার হাতের বাঁধনটা খুলে দিল। একটা কাপড়ের ব্যাগ হাতে দিয়ে বলল- এতে কিছু ফল আর হাতে আঁকা একটা ম্যাপ আছে- যা এই অরণ্যে খুব কাজে লাগবে। আর পিছনের বেড়াটার একদিকের বাঁধন খোলা আছে। যত দ্রুত যত দূরে সরে যেতে পারবে বাঁচার সম্ভাবনা তত বাড়বে। বিদায় বন্ধু বিদায়!
মুক্তির স্বাদ কত যে মধুর তিনি সেদিন বুঝেছিলেন। কোন কিছু না ভেবেই মুহূর্তে বেড়াটা ফাঁক করে রাতের অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছিলেন। ফিরেও এসেছিলেন নিজের পাড়ায়। কিন্তু নিজেকে আর ফিরে পাননি কোনদিন। ইনতিলা নামের সেই মেয়েটি উনার মনে একটা আছড় কেটে দিয়েছিল গভীর ভাবে।
(দুই)
জানি বৃদ্ধের এই গল্পটা কেউ বিশ্বাস করবে না। কিন্তু আমি বৃদ্ধকে চিনি। তবুও আমার সন্দেহ হয়েছিল। তখন সন্দেহ আসলেও গল্পটা শুনার এক বছর পরে এর সত্যতা ঠিকই বুঝেছিলাম। লোকে যদিও আমাকে পাগল বলবে তবুও এখন আমি বুকে হাত রেখে বলতে পারি- বৃদ্ধ সেদিন এক বর্ণও কল্পনা থেকে বলেননি, যা বলেছেন সব সত্য। আসুন আমার সাথে। আপনাদেরকে নিয়ে আরও এক অবিশ্বাস্য বাস্তবতায় প্রবেশ করি।
ঝলমল আকাশ এবং এক মুঠো সোনালী রোদ্র নিয়ে এক সকালে বাড়ি পৌঁছিলাম। একটু বিশ্রাম নিয়ে দুপুরের দিকে উপজাতি পাড়ায় গেলাম। পাড়ায় ঢুকেই অনুভব করতে পারলাম কিছু একটা হয়েছে। চারিদিকে পিনপতন নীরবতা। পাড়ার সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে নির্বাক বসে আছে। বৃদ্ধ সর্দারকে কোথাও দেখতে পেলাম না। জিজ্ঞাসা করলাম। পাড়ার সবাই- এমন কি শিশুরাও মুখ বন্ধ করে রাখল। আমি আমার শিরায় রক্তের গতির দ্রুততা অনুভব করলাম। অনেকক্ষণ পর এক বৃদ্ধা এসে বললেন- সর্দার নাকি দুই দিন যাবত খুব অসুস্থ। মৃত্যুর প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছেন। সকালেও উনার ঘরে নিথর হয়ে শুয়ে ছিলেন। কিন্তু কিছুক্ষণ হল তাকে আর পাওয়া যাচ্ছে না। বৃদ্ধের পায়ের চাপ জঙ্গলের গভীরে ঢুকে গেছে। দশ বারজনের একটা দল প্রস্তুত হয়েছে- বৃদ্ধকে খুঁজে নিয়ে আসবে।
আমি এসবের কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না। তবে বৃদ্ধের জন্য আমার মনটা আন্দোলন শুরু করল। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম এবং তাদেরকে জানালাম- আমি যাব দলটার সাথে। নিষেধের একটা গুঞ্জন উঠল। আমি নাছোড় বান্দার মতো আবার আবদার করলাম। আবার গুঞ্জন উঠল, তবে আগের চেয়ে কম। এভাবে আমি একসময় সফল হলাম। কিন্তু বুঝে উঠতে পারলাম না- বৃদ্ধ কেন এভাবে পালাচ্ছেন। আমার একটা ধারনা ছিল- মৃত্যুর কাছাকাছি চলে আসা একজন অসুস্থ বৃদ্ধ আর কতদূরইবা যেতে পারবেন। কিন্তু তখন যদি ঘূর্ণাক্ষরেও বুঝতে পারতাম পরবর্তী ঘটনা কি হবে, তাহলে মনে হয় স্বার্থপরের মতো ঐ উপজাতি পাড়ায়ই বসে থাকতাম।
গাইড লোকটা পাতার মধ্যেও পায়ের চাপ দেখে নিভূলভাবে বলে দিতে পারছে- বৃদ্ধ কোন দিকে গেছেন। তার এই ক্ষমতা দেখে অবাক না হয়ে পারলাম না। দলটার সবাই শক্তসামর্থ কিন্তু কেমন যেন নির্বাক। কেমন যেন একরোখা। নিভূল পথে অনেকক্ষণ চলেও বৃদ্ধের কোন দেখা পেলাম না। ভেবে ভেবে অস্থির হলাম, কিভাবে একজন অসুস্থ বৃদ্ধ এত দ্রুত, এত দূর আসতে সক্ষম হচ্ছেন। আমরা একসময় ক্লান্ত হয়ে বিশ্রামের জন্য বসলাম। একজন উপজাতি বলল- রাত নামছে, আপনি ফিরতি পথে চলে যান, আমরা বৃদ্ধকে নিয়ে তবেই ফিরব। কথাটা আমাকে কেমন যেন আঘাত করল। আমি আমার মতামত জানালাম- শেষ পর্যন্ত আমি আপনাদের সাথে আছি। কথাটা শেষ হওয়ার সাথে সাথে দলটা উঠে দাঁড়াল। আর পা বাড়ানোর আগেই হঠাৎ করে অরণ্য জুড়ে রাত নামল। অন্ধকার হতে লাগল সবকিছু।
মশালের আলো দিয়ে আমরা বৃদ্ধের পায়ের চাপ অনুসরণ করছি। অনেক আগেই রান্তা বন্ধুর হয়ে গেছে। শরীর আর মানতে চাচ্ছে না। কিন্তু পথ যে শেষ হয় না। কূল কিনারা হারালাম। বৃদ্ধ মৃত্যুর কাছাকাছি এসে কেন এভাবে দূরে পালাতে চাচ্ছেন! আর কিভাবেইবা এ পথে এত দ্রুত এত দূর যাচ্ছেন?
নিজের মস্তিষ্কে পিন ফুটিয়েও কোন সঠিক উত্তর পেলাম না। জঙ্গলের অনেক গভীরে আমরা। চারিদিকে নিশাচরদের পদাচরণ। গা কাটা দিয়ে উঠে প্রতিটা মুহূর্তে। অভিরাম চলতে চলতে ক্লান্ত হয়ে পড়লাম। তবুও কিছু বলতে পারলাম না- পাছে তারা দোষারোপ করবে বলে। পাহাড় উঠি আবার নামি এভাবে যখন অষ্টম পাহাড় ডিঙ্গিয়ে নবম পাহাড়ে উঠলাম; সাথে সাথে আমার শরীরের সব রোম দাঁড়িয়ে গেল। অবাক হলাম! আনমনে ঘড়ি দেখলাম- রাত বারটা বিশ বাজে।
হাসব- না কাঁদব, না ভয়ে কাপব- কী করব বুঝে উঠতে পারলাম না। অনুভূতি হারিয়ে দলটার সাথে দাঁড়িয়ে থাকলাম। পাহাড়টার উপরে বেশ অনেকটা অংশ সমতল। চল্লিশ পঞ্চাশ হাত দুরে একটা মন্দির। প্রায় ধ্বংসস্তুপই বলা যায়। মন্দিরের সামনে একটা কালো বেদী। বেদীতে একটা মশাল জ্বলছে। মশালের কাপা কাপা আলোয় আলোকিত এলাকাটা। বেদীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে অপরূপ এক রূপসী- সাদা কাপড়ে সমস্ত শরীর ঢাকা। দুধে আলতা বাহুযোগল আর মুখমন্ডল যেন মশালের আলোকে ম্লান করে রেখেছে। রূপসীর পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে আছেন বৃদ্ধ সর্দার। জোড় হাত করে কী যেন বলছেন। কিন্তু স্পষ্ট কোন সুর তার গলা থেকে বের হচ্ছে না। রূপসী বৃদ্ধকে দু’হাতে ধরে দাঁড় করাল এবং বৃদ্ধের কংকালসার দেহটা বুকের সাথে চেপে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল।
কিছুক্ষণের পরই রূপসী আমাদের বিষয়ে সচেতন হল। আমাদের অস্তিত্ব তাকে নাড়িয়ে দিল। তবুও সে বৃদ্ধকে ছাড়ল না; বরং আরও জোরে বুকের সাথে চেপে ধরে রেখে স্পষ্ট করে বলল- “বন্ধুরা একটু দূরে সরে থাক। আমার প্রেমিককে আমার বুকে মরতে দাও। সে অনেক বছর আমাকে ভালোবেসে আজ আমার বুকে মরার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে এত কষ্ট করে এত দূর এসেছে। আমি তাকে আমার বুকে ঘুম পাড়িয়ে নেই।”
আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। বৃদ্ধ একসময় রূপসীর বুকে ঢলতে লাগল। মৃত্যুর আগ মুহূর্তে বৃদ্ধ স্পষ্ট একটা বাক্য বলল- “ইনতিলা, আমি আবার ফিরে আসব, অপেক্ষা কর।” রূপসী বৃদ্ধকে ধীরে ধীরে শুইয়ে দিল। নির্বিকার হয়ে রইল কয়েক মূহূর্ত। তারপর হঠাৎ গা ঝাড়া দিয়ে দাঁড়াল এবং সরাসরি চাইল আমার দিকে।
ইনতিলা! ইনতিলা! এসব কি দেখছি আমি, এসব কি শুনছি! কিছুই মিলাতে পারছি না। এই ইনতিলা যদি সেই ইনতিলা হয় তাহলে এই রূপসী এখনো যুবতি থাকল কিভাবে? দিশেহারা হলাম। এমন সময় দেখলাম সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার চাহনি কেমন যেন ঠান্ডা। আমার গায়ে কাটা দিয়ে উঠল। আমি দৃষ্টি দিলাম তার গোটা কাটামোটায়। অবাক হলাম!
না; আমি পারব না এর বর্ণনা দিতে। এমন সাহসও করবও না কোনদিন। শুধু বলব- “কোন মানবী এমন হতে পারে না।” আমি সম্মোহনের মতো তার চোখে চেয়ে রইলাম। সে আলতো করে আমাকে স্পর্শ করল। মাধকতা মেশানো কন্ঠে বলে উঠল- “প্রেয়সী, তুমি তাহলে এখনই ফিরে আসলে। এত তাড়াতাড়ি। আমি কল্পনাও করতে পারিনি- তুমি আমায় এত ভালোবাস। প্রেয়সী, আমি আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করব না। আমি তোমার চিরতরুনী প্রেম ইনতিলা- কসম খাচ্ছি, আমি আর তোমাকে হারাতে চাই না। তুমি আমাকে নাও, এই মুহূর্তে, এই অমাবস্যার রাতে, এই পবিত্র মন্দিরের পবিত্র বেদীতেই। তোমাকে আগেও কতবার বলেছি, আমি চিরতরুনী। তোমাকেও চিরতরুন হতে হবে। আর তার একমাত্র রাস্তা হল তোমার আমার মিলন। আমাকে নিলেই তুমি অমর হয়ে যাবে। পৃথিবীর বুকে শুধু আমরা দু’জন অমর হয়ে অনন্তকাল ভালোবেসে যাব একে অপরকে।” একটা নিঃশ্বাস নিয়ে ইনতিলা পুনরায় শুরু করে- “তোমার মনে আছে সেই অনেক বছর আগে আমার বাবার হাত থেকে, বলীর বেদী থেকে তোমাকে বাঁচিয়েছিলাম। বিনিময়ে আমাকে বলীর বেদীতে শুতে হয়েছিল। আর সেই রাতে আমি নিজের রক্তে রক্তাক্ত হয়ে পেয়েছিলাম অমর জীবন। তুমিও এর প্রতিদান দিয়েছিলে। আমাকে ভালোবেসে আমার কাছে ফিরে এসেছিলে। কিন্তু আমি তোমাকে রাজি করাতে পারিনি তাই তুমি অমর হলে না। এবার যখন ফিরে এসেছ আর ছাড়ছি না; আমি প্রস্তুত, নাও আমাকে। আর স্বাক্ষী থাক তোমার ঐ প্রাণহীন বৃদ্ধ দেহটা, স্বাক্ষী থাক এই মন্দির, স্বাক্ষী থাক এই লোকগুলো।”
আমি বুঝে উঠতে পারলাম না কী করব। হঠাৎ খেয়াল করলাম উপজাতি দলটা হাঁটু গেড়ে জোড় হাতে মাথা নত করে বসে আছে- যেন আরাধনা দেবীর কাছে আরাধনায় ব্যস্ত। কুসংস্কার! কিন্তু এখন আমি কী করি! কী ব্যাখ্যা দেই এসবের!
টায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। আর হিসাবে মাতাল হলাম। রূপসী মানবী- না আতসী এই প্রশ্নের কোন উত্তর পেলাম না। এই গভীর রাতে এই গহীণ অরণ্যেই বা কেন? হায় খোদা এসব কি হচ্ছে? তুমি আমাকে রক্ষা কর।
ইনতিলা একেবারে আমার বুকে বুক স্পর্শ করে দাঁড়াল। তার গরম নিঃশ্বাস আমার শরীর ছুঁয়ে দিল। ইনতিলা আঙ্গুল দিয়ে আমার ঠোঁট স্পর্শ করল। আমি কারেন্টের শক খেলাম। ছিটকে পড়তে চাইলাম। কিন্তু ইনতিলা দু’হাত দিয়ে শক্ত করে ধরে একটানে তার বুকে আমার অনুভূতিহীন দেহটা চেপে ধরল।
মুহূর্তের দশভাগের এক ভাগ। একটা ভয়ংকর চিৎকার রাতের অন্ধকারকে ছিড়ে কুটি কুটি করে ফেলল। আমি কিছু বুঝতে পারলাম না। শুধু দেখলাম- জ্বলন্ত একটা কাটামো সামনে দৌঁড়াচ্ছে এবং হঠাৎ করেই একদম উধাও হয়ে গেল।
বুঝলাম না কিছুই; তবুও সাহস করে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম জ্বলন্ত ইনতিলা যেদিকে দৌঁড়ে গেছে, সেদিকে ত্রিশ হাত দূরে পাহাড়টা খাড়া ঢালে পরিণত হয়ে প্রায় দুইশত ফুট সোজা নেমে গেছে। ঢালের মাথায় এসে দাঁড়ালাম। দেখলাম- নিচে একটা মশাল জ্বলছে; আর কোথাও কিছু নেই। আমরা নির্বাক হয়ে প্রত্যাবর্তনের প্রস্তুতি নিলাম।
আজ অনেক দিন পরও র্নিঘুম রাত কাটাই। কেন ঘুমাতে পারি না, সেটারও কোন সঠিক ব্যাখ্যা পাই না। শুধু গভীর রাতে ঘুমের ঘোরে ইনতিলা এবং সেই দুইশত ফুট নিচের মশালটা দেখে ভয়ে কেপে কেপে উঠি।
***
(১০ অক্টোবর ২০১০ খ্রিস্টাব্দ)