Logo

কমলগঞ্জে যথাযোগ্য মর্যাদায় বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমানের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী পালিত

রাজু দত্ত / ২২ Time View
Update : বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বকনিষ্ঠ বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমানের ৫৫তম শাহাদাতবার্ষিকী মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল ৯টায় উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের দলই সীমান্তে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন কমলগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন, দলই বিওপি এবং কমলগঞ্জ প্রেসক্লাব। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে একটি দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার সন্দ্বীপ তালুকদার, বীর মুক্তিযোদ্ধা আরশাদ আলী, দলই বিওপির ইনচার্জ সুবেদার আক্কাস আলী, কমলগঞ্জ প্রেসক্লাব সভাপতি আসহাবুজ্জামান শাওন, নির্বাহী সদস্য শাব্বির এলাহী, কমলগঞ্জ রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি কবি নির্মল এস পলাশসহ বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

যেভাবে শহীদ হন বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান: ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলার খোরদা খালিশপুর গ্রামের আক্কাস আলী মণ্ডলের ও কায়মুন্নেসার ঘরে ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন হামিদুর রহমান। মাত্র ১৮ বছর বয়সে দেশের টানে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়া এই বীর সেনানী ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠ পদকপ্রাপ্ত শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ।

১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের শেষদিকে বৃহত্তর সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার দলই রণাঙ্গনে প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছিল। চারদিকে চা বাগান, মাঝখানে ধলাই সীমান্ত চৌকি। প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সি কোম্পানির হয়ে দলই সীমান্তের ফাঁড়ি দখল করার অভিযানে অংশ নেন সিপাহি হামিদুর রহমান।

১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর ভোররাতে লেফটেন্যান্ট কাইয়ুমের নেতৃত্বে ১২৫ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল পাকিস্তানি সেনাদের ওপর সাঁড়াশি আক্রমণ চালায়। ব্যাপক গোলাবর্ষণে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে আগুন ধরে যায়। তবে শক্রু অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছালে একটি মাইন বিস্ফোরিত হয় এবং পাক বাহিনীর মেশিনগানের তীব্র গুলিবর্ষণে মুক্তিযোদ্ধারা সামনে অগ্রসর হতে পারছিলেন না। তখন পাকিস্তানি মেশিনগান পোস্টে গ্রেনেড হামলার মতো চরম ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব স্বেচ্ছায় কাঁধে তুলে নেন হামিদুর রহমান।

পাহাড়ি খালের মধ্য দিয়ে বুকে হেঁটে গ্রেনেড নিয়ে আক্রমণ শুরু করেন তিনি। তাঁর ছোড়া দুটি গ্রেনেড সফলভাবে মেশিনগান পোস্টে আঘাত হানে। এ অবস্থাতেই গুলিবিদ্ধ হয়েও মেশিনগান পোস্টে গিয়ে সেখানকার দুই পাকিস্তানি সেনার সাথে হাতাহাতি যুদ্ধ করে পোস্টটি অকার্যকর করে দেন তিনি। তাঁর এই বীরত্বপূর্ণ পদক্ষেপে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারা বিজয়ী হয়ে সীমান্ত ফাঁড়ি দখল করেন। তবে বিজয়ের স্বাদ দেখে যেতে পারেননি তিনি; পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে দলই সীমান্তেই শাহাদাতবরণ করেন এই বীর।

দেহাবশেষ দেশে প্রত্যাবর্তন ও স্মৃতিচারণ: ফাঁড়ি দখলের পর সহযোদ্ধারা তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে সীমান্তের অল্প দূরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামের স্থানীয় এক পরিবারের পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করেছিলেন। ২০০৭ সালের ২৭ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকার শহীদ হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়। সে অনুযায়ী ২০০৭ সালের ১০ ডিসেম্বর ত্রিপুরা সীমান্ত থেকে তাঁর দেহাবশেষ গ্রহণ করে এবং ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানকে ঢাকার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

স্বাধীনতার পর দলই সীমান্ত ফাঁড়ির তৎকালীন বিডিআরের পক্ষ থেকে স্থানীয়ভাবে একটি নামফলক স্থাপন করা হয় এবং ২০০৫ সালে সেখানে একটি স্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। স্থানীয়দের মতে, প্রতি বছর ২৮ অক্টোবর পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও দোয়া মাহফিলের মাধ্যমে দিনটি স্মরণ করা হলেও এই বীরের স্মরণে স্থানীয়ভাবে আরও বড় পরিসরে আলোচনা সভার উদ্যোগ নেওয়ার দাবি রয়েছে এলাকাবাসীর। ১৮ বছর বয়সে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করা এই বীরের রক্তে আজও ভিজে রয়েছে দলই সীমান্তের মাটি।


ধর্ম
Developed By Arolaxltd
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!