Logo

কমলগঞ্জে অসুস্থ গর্ভবতীকে হাসপাতালে রেখে চলে গেলেন স্বজন, চিকিৎসায় সহায়তা করলেন কর্মকর্তা

কমলকন্ঠ ডেক্স / ২৬ Time View
Update : শনিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৬

অসুস্থ গর্ভবতী বোনকে হাসপাতালে রেখে চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর স্বজনদের বিরুদ্ধে। পরে ওই নারীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিৎসক। এ সময় একজন স্বেচ্ছাসেবক ও হাসপাতালের নার্সের সহযোগিতায় তাঁকে অ্যাম্বুলেন্সে করে জেলা সদরে নেওয়া হয়। পথে সন্তান প্রসব করলেও নবজাতকটি মৃত জন্ম নেয়। পরবর্তী সময়ে এক কর্মকর্তার আর্থিক সহযোগিতায় ওই নারীর চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়। বর্তমানে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটছে তাঁর পরিবারের। তাঁর প্রায় সাত বছর বয়সী মেয়েটিও এখনো বিদ্যালয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়নি।

গত ৪ অক্টোবর বিকেল ৫টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পরবর্তী সময়ে রোগীর খোঁজখবর নিতে গিয়ে তাঁর পরিবারের অসহায়ত্বের বিষয়টি সামনে আসে। এ ঘটনায় সহযোগিতাকারী ব্যক্তি জাতীয় দৈনিক আমার সংবাদ-এর কমলগঞ্জের সংবাদকর্মী ও একজন স্বেচ্ছাসেবক। তিনি নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, অসুস্থ ওই নারীকে তাঁর এক ভাই রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। পরে তাঁকে সেখানে রেখে চলে যান তিনি। একপর্যায়ে রোগীর খিঁচুনি শুরু হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা সদর হাসপাতালে স্থানান্তরের প্রয়োজন দেখা দেয়। কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. সোনালী দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করেন এবং রোগীর সঙ্গে যাওয়ার জন্য উপস্থিত লোকজনের সহযোগিতা চান।

খবর পেয়ে হাসপাতালে পৌঁছে ওই স্বেচ্ছাসেবক রোগীর পরিচয় ও স্বজনদের সন্ধানে ২৫ থেকে ৩০ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরে রোগীর দুই ভাইয়ের সন্ধান পেয়ে তাঁদের জেলা সদর হাসপাতালে যেতে বলেন। চিকিৎসার খরচের বিষয়েও সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি। একপর্যায়ে চিকিৎসকের অনুরোধে রোগীর সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সে যান স্বেচ্ছাসেবক। তাঁর সঙ্গে ছিলেন হাসপাতালের নার্স স্মৃতি।

অ্যাম্বুলেন্সটি জেলা সদর হাসপাতালে যাওয়ার পথে রোগীর প্রসবব্যথা বেড়ে যায়। নার্স স্মৃতির সহযোগিতায় অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরেই সন্তান প্রসব করেন ওই নারী। তবে নবজাতকটি মৃত জন্ম নেয়। পরে জেলা সদর হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে নেওয়া হলে নার্স ও মিডওয়াইফরা রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেন। এ সময় মায়ের গর্ভফুল বের না হওয়ায় নার্স স্মৃতি চিকিৎসাসেবায় সহযোগিতা করেন।

এদিকে ঘটনার দিন অ্যাম্বুলেন্স ছাড়ার আগে ওই নারীর বৃদ্ধ বাবা হাসপাতালে উপস্থিত হন। তাঁর চোখে কম দেখেন, কানে কম শোনেন এবং চলাফেরায়ও অসুবিধা রয়েছে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে মেয়ের সংকটময় পরিস্থিতিতে তাঁর পক্ষে কার্যকরভাবে সহযোগিতা করা সম্ভব হচ্ছিল না।

পরদিন ৫ অক্টোবর রোগীর স্বজনেরা ফোন করে ওষুধ কেনার জন্য আর্থিক সহযোগিতা চান। এরপর ওই স্বেচ্ছাসেবক একজন পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ঘটনাটি শুনে কর্মকর্তা সহযোগিতার আশ্বাস দেন এবং প্রয়োজনে উন্নত চিকিৎসা ও জরুরি রক্তের ব্যবস্থার কথাও জানান।

৬ অক্টোবর দুপুর ২টা ৯ মিনিটে ওই কর্মকর্তা রোগীর চিকিৎসার জন্য একটি খামে করে অর্থসহায়তা দেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি প্রায় ৩০ মিনিট অপেক্ষা করেন এবং রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় স্বেচ্ছাসেবক ও আনোয়ার নামের এক ব্যক্তি রোগীর ছোট ভাইকে সঙ্গে আনার চেষ্টা করলে তিনি পালিয়ে যান। পরে তাঁর বড় ভাইকে নিয়ে এসে কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলানো হয়।

এরপর থেকে রোগীর নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হয়। গত ২২ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে ওই নারীর বাড়িতে গিয়ে তাঁর পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার চিত্র দেখা যায়।

মাত্র সাত ফুট বাই নয় ফুটের একটি ঘরে বসবাস করেন ওই নারী ও তাঁর পরিবার। ঘরে বাঁশের তৈরি ঘুমানোর চৌকি, এক কোণে রান্নার চুলা এবং ছেঁড়া কাপড় দিয়ে তৈরি কাপড় রাখার অস্থায়ী আলনা রয়েছে। প্রয়োজনীয় আসবাব ও বাসনপত্রও সীমিত। বিভিন্ন সময়ে মানুষের দেওয়া চাল, রান্না করা খাবার ও অন্যান্য সহযোগিতায় তাঁদের সংসার চলে।

ওই নারীর প্রথম স্বামীর ঘরে প্রায় ৯-১০ বছর বয়সী একটি মেয়ে রয়েছে। দারিদ্র্যের কারণে শিশুটি কখনো বিদ্যালয়ে যায়নি। নিজের নাম লেখা কিংবা ঠিকমতো গণনা করতেও পারে না সে। শিশুটির সঙ্গে কথা বলে তাকে বিদ্যালয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়েছেন ওই স্বেচ্ছাসেবক।

জানা গেছে, ওই নারীর দ্বিতীয় স্বামী তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। তাঁর বাবা-মায়েরও জাতীয় পরিচয়পত্র নেই। আর্থিক সংকটের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবও তাঁদের জীবনকে জটিল করে তুলেছে। ওই নারীর দ্বিতীয় স্বামীই তাঁর মৃত নবজাতকের বাবা বলে জানা গেছে।

ওই স্বেচ্ছাসেবক জানান, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী পরিবারটিকে সহযোগিতা করেছেন তিনি। তবে একার পক্ষে তাঁদের সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। শিশুটিকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার চেষ্টা করবেন তিনি। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ এগিয়ে এলে পরিবারটির দুর্দশা কিছুটা লাঘব হতে পারে।

এ ঘটনায় কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. সোনালী, নার্স স্মৃতি, অ্যাম্বুলেন্সচালক, আনোয়ার এবং পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তার সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংকটময় পরিস্থিতিতে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।


ধর্ম
Developed By Arolaxltd
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!