Logo

বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে সিলেটের স্বাদ-ঐতিহ্য চুঙ্গাপুড়া পিঠা

রাজু দত্ত / ৮৪ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী, ২০২৬

রাজু দত্ত ।।

সিলেটের প্রাচীন ঐতিহ্য চুঙ্গাপুড়া পিঠা প্রায় বিলুপ্তির পথে। গ্রামীণ এলাকার বাড়িগুলোতে চুঙ্গাপুড়ার আয়োজন তেমন আর হয় না। তাই শীতের রাতে খড়কুটো জ্বালিয়ে সারা রাত চুঙ্গাপুড়ার দৃশ্যও দেখা যায় না। একসময় বাজারে মাছের মেলা বসত। মেলা থেকে মাছ কিনে কিংবা হাওর-নদী থেকে ধরা হতো রুই, কাতলা, চিতল, বোয়াল, পাবদা, কই ও মাগুর মাছ। তারপর সেই মাছ হালকা মসলা দিয়ে ভেজে (আঞ্চলিক ভাষায় মাছ বিরাণ) চুঙ্গাপুড়া পিঠা খাওয়া ছিল সিলেট ও মৌলভীবাজারের একটি অন্যতম ঐতিহ্য।

বাড়িতে মেহমান বা নতুন জামাইকে চুঙ্গাপুড়া পিঠা মাছ বিরাণ আর নারিকেলের পিঠা পরিবেশন না করলে যেন লজ্জায় যেন মাথা কাটা যেত। এখন আর সেই দিন নেই। চুঙ্গাপিঠা তৈরির প্রধান উপকরণ ঢলু বাঁশ ও বিন্নি ধানের চাল (বিরইন ধানের চাল) সরবরাহ অনেক কমে গেছে। অনেক স্থানে আগের মতো তেমন চাষাবাদও হয় না।

মৌলভীবাজারের বড়লেখার পাথরিয়া পাহাড়, জুড়ীর লাঠিটিলা, রাজনগর, কমলগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলার উঁচু-নিচু টিলা, চা-বাগান ও জুড়ী উপজেলার চুঙ্গাবাড়ীতে প্রচুর ঢলু বাঁশ পাওয়া যেত। বনদস্যু, ভূমিদস্যু ও পাহাড়খেকোদের কারণে বনাঞ্চল উজাড় হয়ে যাওয়ায় হারিয়ে গেছে ঢলু বাঁশ। তবে জেলার কিছু কিছু টিলায় সীমিত পরিমাণে ঢলু বাঁশ পাওয়া যায়। পাহাড়ে আগের মতো বাঁশ নেই বলে বাজারে ঢলু বাঁশের দামও বেশ চড়া।

ঢলু বাঁশ ছাড়া চুঙ্গাপিঠা তৈরি করা যায় না কারণ এই বাঁশে এক ধরনের তৈলাক্ত রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যা আগুনে বাঁশের চুঙ্গাকে না পোড়াতে সাহায্য করে। ঢলু বাঁশে অত্যধিক রস থাকায় আগুনে না পুড়ে ভিতরের পিঠা আগুনের তাপে আগে সিদ্ধ হয়ে যায়। কোনো কোনো অঞ্চলে চুঙ্গার ভেতরে বিন্নি চাল, দুধ, চিনি, নারিকেল ও চালের গুঁড়া দিয়ে পিঠা তৈরি করা হয়। পিঠা তৈরি হয়ে গেলে মোমবাতির মতো চুঙ্গা থেকে পিঠা আলাদা হয়ে যায়। চুঙ্গা পিঠা পোড়াতে প্রচুর পরিমাণে খড়ের (নেরা) দরকার পড়ে।

পিঠা তৈরি করার জন্য কমলগঞ্জ উপজেলার মুন্সীবাজারে ঢলু বাঁশ নিতে আসা পিন্টু ও প্রনীত দেবনাথ জানান, ‘আসলে সব সময় তো এই জিনিসগুলো পাওয়া যায় না। পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে এগুলো খুব কম পরিমাণ বাজারে উঠেছে। আজ থেকে ১০ কিংবা ১৫ বছর আগে প্রচুর দেখা যেত। এখন কালের বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে। বাজারে আসার সময় পরিবারের সদস্যরা বলল পিঠা তৈরির জন্য ঢলু বাঁশ নিয়ে যেতে। তাই কয়েকটা বাজার ঘুরে দেখলাম কিন্তু পেলাম না। মুন্সীবাজারে অল্প পরিমাণ ঢলু বাঁশ নিয়ে এসেছেন বিক্রেতারা। সেখান থেকে নিয়ে যাচ্ছি।’

কমলগঞ্জ উপজেলার লেখক ও কবি সাজ্জাদুল হক স্বপন জানান, ‘একটু সাহস করে খুলতে পারলেই পাবেন লুকিয়ে থাকা সুস্বাদু মনোমুগ্ধকর এক প্রকার পিঠা। তাই কিছুটা সময় অপেক্ষা করে পিঠা খেলে সেই স্বাদটা পাওয়া যায়। তা ছাড়া সিলেটের প্রাচীন ঐতিহ্য পিঠে-পুলির অন্যতম চুঙ্গাপুড়া পিঠা। পিঠা তৈরির জন্য ঢলু বাঁশ খুব কম পাওয়া যায়। আগের মতো আর নেই। প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।’


More News Of This Category
Developed By Radwan Ahmed
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!