মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের তেতইগাঁওয়ের মণিপুরী কালচারাল কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হলো মণিপুরী সম্প্রদায়ের প্রাচীন ঐতিহ্যের উৎসব ‘লাই হারাওবা’। গত ৮ এপ্রিল শুরু হওয়া তিন দিনব্যাপী এই উৎসবের সমাপনী দিন ছিল শুক্রবার (১০ এপ্রিল)।
শুক্রবার দিনব্যাপী ঢোল, খোল, বাঁশি ও পেনাসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের সুরে মুখর হয়ে ওঠে উৎসব প্রাঙ্গণ। সন্ধ্যা নামতেই উন্মুক্ত মঞ্চে শুরু হয় বিশেষ নৃত্য পরিবেশনা। নারী, কিশোরী ও শিশুদের অংশগ্রহণে মঞ্চ যেন জলতরঙ্গের মতো নেচে ওঠে। সুর, তাল ও মুদ্রার মূর্ছনায় সন্ধ্যা ডুবে যায় এক স্নিগ্ধ ও প্রার্থনাময় আবহে।
বিকেলে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের তেতইগাঁওয়ে অবস্থিত মণিপুরী সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে দর্শনার্থীদের ভিড় জমে। তিন দিনের এই উৎসবের শুরু থেকেই চলে নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান। উৎসবের অর্থায়ন করেছে ইউনেস্কো বাংলাদেশ এবং বাস্তবায়নে ছিল বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর।
উৎসব প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই সাংস্কৃতিক আয়োজনে মুখরিত হয়ে ওঠে প্রাঙ্গণ। আচার-অনুষ্ঠান ও নাচে অংশ নিতে কুশীলবরাও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ঢোল-খোল ও বাঁশিসহ নানা বাদ্যযন্ত্রের সুরের ঝংকার চলতে থাকে প্রাঙ্গণজুড়ে। উন্মুক্ত মঞ্চে নারী, তরুণী ও শিশু-কিশোরীদের সুনিপুণ নৃত্য পরিবেশনা সবাইকে মুগ্ধ করে। গান ও সুরের তালে নানা মুদ্রায় দীর্ঘ সময় ধরে চলে এই নাচ। একদিকে ফাল্গুনের খোলা হাওয়া, অন্যদিকে সুরের মূর্ছনা—সব মিলিয়ে উপস্থিত সবাই এক অপূর্ব মুগ্ধতায় ডুবে থাকেন।
আয়োজকরা জানান, ‘লাই হারাওবা’ মণিপুরী জনগোষ্ঠীর অন্যতম প্রাচীন ও পবিত্র উৎসব। ‘লাই’ অর্থ দেবতা এবং ‘হারাওবা’ অর্থ আনন্দ; অর্থাৎ দেবতাদের আনন্দোৎসব। এই উৎসবের মূল আকর্ষণ হলো ‘লাই হারাওবা জগোই’, যা মণিপুরী নৃত্যের আদি রূপ হিসেবে বিবেচিত। এই নৃত্যের মাধ্যমে ‘মাইবি’ (নারী পুরোহিত) দেবতাদের সন্তুষ্ট করার পাশাপাশি সৃষ্টিতত্ত্ব, প্রকৃতি ও মানবজীবনের নানা পর্যায় তুলে ধরেন।
লাই হারাওবা স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য সচিব ওইমান লানথই বলেন, “এটি মণিপুরী জনগোষ্ঠীর এক জীবন্ত ঐতিহ্য, যা প্রাচীন মেইতেই সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত এবং প্রকৃতি ও মানুষের আত্মিক সম্পর্ককে ধারণ করে।
কমিটির আহ্বায়ক ইবুংহাল সিনহা শ্যামল বলেন, “মাইবিদের নৃত্য এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ, যার মাধ্যমে পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধা, আধ্যাত্মিক চর্চা ও নতুন প্রজন্মের কাছে সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়। ইউনেস্কো বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সহায়তায় আয়োজিত এই উৎসব শুধু একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়, এটি বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।