Logo

কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গলে হারিয়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ১১টি মাতৃভাষা

Reporter Name / ৩৩২ Time View
Update : বুধবার, ২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২২

কমলকন্ঠ ডেস্ক।। ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে তাদের বিশ্বাস, প্রথা, আচার, জ্ঞান ও সঙ্গীত হারিয়ে যাওয়া। এগুলি সম্পদ বিশেষ। তাই ধ্বংসের হুমকির মুখে থাকা ভাষাগুলির পরিচর্চা, শিশুদের নিজস্ব মাতৃভাষায় স্কুলে পঠন পাঠনের ব্যবস্থা করা জরুরী হয়েছে।” কথাগুলো বললেন মণিপুরী সাহিত্য পরিষদ এর সভাপতি লেখক, গবেষক অধ্যাপক ড. রণজিত সিংহ।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গলসহ বিভিন্ন স্থানে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষা রয়েছে সংকটে। তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি, ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য, কৃষ্টি, প্রথা ও উৎসব বাঙালিদের মুগ্ধ করলেও চর্চা ও সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যেতে বসেছে তাদের মাতৃভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা কেন্দ্র ও সরকারি পৃষ্টপোষকতা না পাওয়ার কারনে তাদের মাতৃভাষা এবং নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি রয়েছে হুমকির মুখে বলে দাবি তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

অধ্যাপক ড. রণজিত সিংহ আরও বলেন, “কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গলে বসবাসরত প্রায় ১১টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষাগুলি দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। পরিবারে মা, বাবা, ভাইবোন ও প্রতিবেশীর সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলে স্বাচ্ছন্দবোধ করে সে ভাষায় স্কুলে পড়ানো হয় না। স্কুলে শিশুরা বাংলা ভাষা বুঝতে না পারার কারণে শিক্ষকদের সাথে তেমন কথাবার্তায় অংশগ্রহণ করতে পারে না, প্রশ্ন করতে পারে না, বুঝতেও পারে না। তাই ধীরে ধীরে এসব শিশুরা পিছিয়ে পড়ে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষজনের নিজস্ব মাতৃভাষাই জাতিগত স্বত্তাকে বাঁচিয়ে রাখে। চিরন্তন জাতিজন শতশত বৎসর যাবত তাদের সমাজকে পরিপোষণ করে নির্ভর করে আসছে শ্রুতির উপর, যার ভরকেন্দ্র হচ্ছে তাদের নিজস্ব ভাষা। বর্তমানে এই ভাষাগুলো ক্রমাম্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে।”

তবে ২০১৮ সাল থেকে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা (ককবরক), গারো ও ওঁরাও (সাদরি) এই পাঁচ জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য প্রাক-প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষায় বই দেয়া হয়। তবে এটির সাথে শিক্ষক প্রশিক্ষণ, চর্চা কেন্দ্র ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার বইও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্তভর্‚ক্ত করার দাবি রয়েছে। 
অনুসন্ধানে জানা যায়, বৃহত্তর সিলেটে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকায় খাসিয়া, গাঢ়ো (মান্দী), ত্রিপুরা, মুন্ডা, সাওতাল, বিষ্ণুপ্রিয়া, মণিপুরী, মৈতৈ মনিপুরীসহ ১৩টি সম্প্রদায় রয়েছে। এদের বাইরে চা বাগানে তেলেগু, রবিদাস, বাউরী, গোয়ালা, নাইডু, পাত্র, রিকিয়াশন, উড়াং, ছত্রী, গোস্বামী, গঞ্জুসহ অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠির বসবাস। এদের অধিকাংশরা পাহাড়-টিলার পাদদেশে, বনজঙ্গলে ও সমতল ভ‚মিতে প্রাকৃতিক পরিবেশে জীবন যাপনকারী সম্প্রদায়রা দেশে অর্থনৈতিকভাবে যথেষ্ট অবদানও রাখছেন। তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমির অধিকারসহ জনগুরুত্বপূর্ণ সমস্যার পাশাপাশি নিজেদের মাতৃভাষাকেও হারাতে বসেছেন। নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক মাতৃভাষা চর্চাকেন্দ্র না থাকা, সরকারি পৃষ্টপোষকতার অভাব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘরসহ অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ব্যবহারের কারণে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষার অধিকার হারাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

বৃহত্তর আদিবাসী ফোরাম সিলেট এর সভাপতি পিডিসন প্রধান সুচিয়ান বলেন, আমাদের মাতৃভাষা শুধুমাত্র নিজেদের মধ্যে চর্চা হচ্ছে। প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে খাসি ভাষা নেই। খাসি ভাষাটা অন্তভর্‚ক্ত হলে ভালো হতো। আমাদের নিজেদের স্কুলের জন্য নিজেদের ব্যয়ে বই-পুস্তক ভারত থেকে সংগ্রহ করে শিক্ষক দিয়ে স্কুল পরিচালনা করছি।

কমলগঞ্জের মণিপুরী ললিতকলা একাডেমীর গবেষণা কর্মকর্তা প্রভাস চন্দ্র সিংহ বলেন, সন্তানরা স্কুলে এসেই বাংলা, ইংলিশ ভাষা পায়, মাতৃভাষা পাচ্ছে না। যে দেশের মানুষ ভাষার জন্য আত্মবলিদান দেয় ওই দেশে অন্যান্য ভাষা রক্ষার চেষ্টা না করলে খুবই দু:খজনক।

মণিপুরী আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সমরজিত সিংহ ও মনিপুরী থিয়েটারের সভাপতি ও নাট্যকার শুভাশীষ সিনহা বলেন, বাংলা ও ইংরেজীতে শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হওয়ায় আমাদের মনিপুরীদের ভাষাও সংকটে রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বা একাডেমীক কোন চর্চার ব্যবস্থা না থাকলে আগামীতে আরও সংকটে পড়বে আমাদের মাতৃভাষা।

শমশেরনগর চা বাগানের প্রাক্তন শিক্ষক অপূর্ব নারায়ন ও চা মজদুর পত্রিকার সম্পাদক সীতারাম বীন বলেন, চা বাগানে আমাদের অসংখ্য ভাষাভাষির লোকেরা নিজস্ব মাতৃভাষা ব্যবহার এবং বাড়িঘরেও চর্চা না করার কারনে মাতৃভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। এজন্য সরকারি পৃষ্টপোষকতায় ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মাতৃভাষা চর্চা কেন্দ্র চালু করা প্রয়োজন।

প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী কবি শহীদ সাগ্নিক বলেন, সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনকৃত সমাজ ব্যবস্থায় প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠীর ভাষা হুমকির মুখে। সা¤্রাজ্যবাদী চক্রান্তের কবল থেকে মানুষ মুক্ত হলে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও মানুষের জীবন যাপন বিকশিত ও তাদের জাতীয় সংস্কৃতি স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল হয়ে উঠবে।


More News Of This Category
Developed By Radwan Ahmed
error: Content is protected !!
error: Content is protected !!