
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার ১৯৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’। প্রায় শতবর্ষী এই বিদ্যালয়টি দীর্ঘকাল ধরে নারী শিক্ষার প্রসারে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে আসছে। কিন্তু বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। গত তিন বছর ধরে এই বিদ্যালয়ে একজনও নারী শিক্ষক নেই। এর ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা তাদের দৈনন্দিন নানা শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কথা শেয়ার করতে গিয়ে তীব্র লজ্জা ও অস্বস্তির মুখোমুখি হচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
বিদ্যালয়ের বর্তমান জনবল কাঠামো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এখানে শিক্ষকের মোট পদ রয়েছে ১৯টি। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১৩ জন শিক্ষক। অর্থাৎ ৬টি পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৩ সাল থেকে বিদ্যালয়টিতে কোনো নারী শিক্ষক নেই। প্রধান শিক্ষকের পদটিও দীর্ঘ তিন বছর ধরে শূন্য পড়ে আছে। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন মো. জহির আলী। নিয়মিত প্রধান শিক্ষক ও নারী শিক্ষকের অভাবে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড এবং পাঠদান প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্যমতে, বিদ্যালয় পরিবেশে নারী শিক্ষকের অনুপস্থিতি তাদের ব্যক্তিগত ও মানসিক বিকাশে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানায়, ‘পিরিয়ড বা হঠাৎ শারীরিক কোনো সমস্যায় পড়লে আমরা চরম অসহায় হয়ে পড়ি। অনেক সময় প্রয়োজনীয় স্যানিটারি ন্যাপকিন সঙ্গে থাকে না। লজ্জায় পুরুষ শিক্ষকদের কাছে নিজের সমস্যাটি খুলে বলতে পারি না, ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুপচাপ অস্বস্তির মধ্যে ক্লাসে বসে থাকতে হয়।’
বৈশাখী পাল নামে আরেক শিক্ষার্থী জানায়, ‘স্যাররা আমাদের পাঠদানে আন্তরিক, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মেয়েদের এমন কিছু শারীরিক ও ব্যক্তিগত বিষয় থাকে যা কেবল একজন নারী শিক্ষকের সাথেই স্বাচ্ছন্দ্যে আলোচনা করা সম্ভব। এছাড়া আমাদের যে গার্লস গাইড দল রয়েছে, নারী প্রশিক্ষক না থাকায় তার কার্যক্রম কার্যত বন্ধের পথে।’
শিক্ষার্থীদের চেয়েও বেশি উদ্বিগ্ন তাদের অভিভাবকরা। অভিভাবক শাহাদাত হোসেন মুন্সি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এটি একটি বালিকা বিদ্যালয়, অথচ এখানে একজনও নারী শিক্ষক নেই—এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। একজন নারী শিক্ষক অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেন, যা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। বর্তমানে মেয়েরা তাদের সমস্যাগুলো চেপে রাখছে, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে।’
বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মো. কামাল উদ্দিন জানান, শিক্ষক সংকটের মধ্যেও আমরা পাঠদান চালিয়ে নেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তবে সহশিক্ষা কার্যক্রম, স্কাউটিং এবং বিভিন্ন বাইরের প্রতিযোগিতায় মেয়েদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একজন নারী শিক্ষকের অভাব পদে পদে অনুভূত হয়।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জহির আলী বলেন, ‘বিষয়টি আমরা একাধিকবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। বিশেষ করে বালিকা বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ পূরণ করা এখন সময়ের দাবি। শিক্ষার্থীদের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন।’
সব প্রতিকূলতা ছাপিয়েও বিদ্যালয়টির একাডেমিক ফলাফল ঈর্ষণীয়। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় ১১৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ১০৭ জন কৃতকার্য হয়েছে। পাসের হার ৯২ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪১ জন শিক্ষার্থী। শিক্ষার গুণগত মান ধরে রাখলেও অবকাঠামোগত ও জনবল সংকটে এই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহল।
এ বিষয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সামছুন নাহার পারভীন জানান, ‘আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছি এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বারবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই এখানে নারী শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হবে।’
শিক্ষানুরাগী ও অভিভাবকরা মনে করছেন, ঐতিহ্যের এই বিদ্যাপীঠে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার অতি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।